সর্বশেষ:

মো. জিহাদ লস্কর

ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ,
পঞ্চম বর্ষ

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

রাস্তায় একজনের মুখে সরাসরি সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দিলো আনিস। আচমকা এ আচরণে কিংকর্তব্যবিমূঢ় লোকটি এক পর্যায়ে মেজাজ হারিয়ে তেড়ে আসলো আনিসকে মারতে।আনিসও কম যায় না। কোনোভাবে তাদেরকে শান্ত করে আনিসকে দূরে সরিয়ে নিলাম।

পড়ন্ত বিকেল। টিএসসিতে বসে চা খাচ্ছি আমি আর আনিস। আনিস আমার বন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলাতে পড়াশোনা করে। এইচএসসি পর্যন্ত একই কলেজে পড়েছি। খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলো। ঢাকাতে এসে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে সিগারেট ধরেছে সে।

আর আমি! এই টুকটাক কবিরাজি শিখছি আর কি!

কথা প্রসঙ্গে বললাম, সিগারেট না খেলেই তো পারিস।

পাবলিকের একটা দোষ বুঝলি, সিগারেট খেলে এমন কি ক্ষতি হয়, লোকটার এভাবে রেগে যাওয়ার মতো কারণ ছিলো বল, জবাব দিলো আনিস। 

সিগারেট খেলে ক্ষতি হয় না? জানতে চাইলাম তার কাছে। 

আনিস: ক্ষতি না ছাই! কই হাজারটা লোককে প্রতিদিন সিগারেট খেতে দেখি, ৩০-৪০ বছর ধরে সিগারেট খাচ্ছে কিন্তু কিছুই তো হয় না।

ওহ, আচ্ছা! এই তাহলে তোর ধারণা? সিগারেট কি ক্ষতি করে শুনবি?

আনিস: বল শুনি।

আমাকে প্রায়শই ওয়ার্ডে যেতে হয়, রোগীর হিস্ট্রি নেওয়ার জন্য। তো যখন নিউরোলজি ওয়ার্ডে যাই, তখন প্রতিদিন অনেক স্ট্রোকের (মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ) রোগী দেখতে পাই। স্ট্রোকটা কেন হলো, যখনই আমি খুঁজতে যাই, দেখি, রোগীটি নিয়মিত প্রচুর ধূমপান করতো।

আমি যখন রেসপিরেটরি মেডিসিন ওয়ার্ডে যাই, প্রতিদিন প্রচুর ফুসফুসে ক্যান্সারের রোগী দেখি, COPD এর রোগী দেখতে পাই, তাদের প্রত্যেকেরই একটা দীর্ঘসময়ের ধুমপানের হিস্ট্রি পাই।

এখানেই শেষ নয়, চল এবার বইয়ের কথায় আসি। স্মল সেল ক্যান্সার নামে একটা ক্যান্সার আছে, যেটা কিনা ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই ধুমপানের জন্য হয়।

আমি যখন কার্ডিওলজি ওয়ার্ডে যাই, দেখি অসংখ্য হার্ট অ্যাটাকের রোগীর সঙ্গে ধুমপানের বিষয়টি সরাসরি জড়িত। যখন ইউরোলজিতে যাই, দেখি ব্লাডার ক্যান্সারের রোগীদেরও একটা বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে ধূমপান করতো!

কয়েক দিন আগে গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজি ওয়ার্ডে গিয়েছিলাম। দেখলাম, পেপটিক আলসার ডিজিজ এবং গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারের মতো বড় সমস্যারও অন্যতম কারণ এই ধূমপান!

আনিস: ভাই, থাম। এগুলো সত্যিই হয় নাকি! আমি তো এগুলো জানতামই না। জানলেও বিশ্বাস করতাম না।

আরে, শেষ হয়নি তো! শোন ব্যাটা—

দিনে ২০টা সিগারেট খাওয়া ধূমপায়ী প্রতি বছর প্রায় এক কাপ পরিমাণ টার (আলকাতরা) ধোঁয়ার সঙ্গে ভেতরে নেয়। এই টার ফুসফুসে ঝুল সৃষ্টি করে আবৃত করে রাখে।

গর্ভাবস্থায় স্মোকিং করলে ঘনঘন গর্ভপাত, জন্মের আগেই বাচ্চার মৃত্যু হতে পারে। আর বাচ্চার যদি জন্ম হয়ও দেখা যায়, সেই বাচ্চা কম ওজন নিয়ে বা অপরিণত অবস্থায় জন্মগ্রহন করে। 

এছাড়া সিগারেট মুখে বাজে গন্ধ সৃষ্টি করে। দাঁতের ও মাড়ির ক্ষয় ঘটায়।

সিগারেটের কারণে ত্বকে অক্সিজেন কম আসে, ফলে অল্প বয়সে বৃদ্ধদের মতো রুক্ষ্ম ত্বকের সৃষ্টি হয়। এমনকি কম অক্সিজেনের কারণে অঙ্গে পঁচন দেখা দিলে শেষ পর্যন্ত তা কেটে ফেলা ছাড়া উপায় থাকে না।

এমনকি ধূমপান হাড়েরও ক্ষয় ঘটায়।

ওহ আচ্ছা, দাঁড়া আসল কথাটাই তো এখনো বলা হয়নি! তুই তো কয়েকদিন পরেই বিয়ের পিঁড়িতে পা দেওয়ার পরিকল্পনা করছিস তাই না? তাহলে জেনে রাখ, যৌনশক্তি হ্রাস পাবারও অন্যতম কারনও এই ধূমপান!

আনিস: ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য এতোটাই ক্ষতিকর! তো এই কথাগুলো তুই আমাকে আগে বলিসনি কেন? এখন বুঝতে পারছি, হলের আরিদ ভাইয়ের যে পাকস্থলিতে ক্যান্সার হয়েছিলো এটা বোধহয় ধূমপানের জন্যই হয়েছিলো। দোস্ত, এটা থেকে কি মুক্তি নেই? অনেক চেষ্টা করেছি রে, ছাড়তে পারি না!

শোন দোস্ত, তুই যে ভুল করছিস এই অনুভূতিটা যে তোর মধ্যে আছে এটাই অনেক। এটা থাকলে ইনশাআল্লাহ তুই ধূমপান ছাড়তে পারবি। এতক্ষণ তো শুনলি চিকিৎসা বিজ্ঞানের বক্তব্য, যা থেকে ধূমপানের ক্ষতিকর নানা দিক উঠে এসেছে। এবার স্পিরিচুয়াল দিক থেকে দেখলে ধূমপানের মাধ্যমে তুই আল্লাহর হক ও বান্দার হক দুইটাকেই বঞ্চিত করছিস।

আনিস: কিভাবে?

ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, ‘যা কিছু অপবিত্র ও ক্ষতিকর তাই হারাম’। সিগারেট যে ক্ষতিকর এটা তো স্পষ্ট, তাই ধূমপান হারাম। আর বান্দার হক কিভাবে নষ্ট করছিস, এটা বুঝতে হলে আজ বিকালের ঘটনাটা মনে করতে হবে। সিগারেটের ধোঁয়ায় একটা লোকের কষ্ট হচ্ছিলো তথাপি তার মুখে বা আশপাশে ধোঁয়া ছেড়ে তাকে কষ্ট দিচ্ছিলি! প্যাসিভ স্মোকিং বা পরোক্ষ ধোয়ার কারণে পরিবারের একদম ছোট শিশুটারও হতে পারে ফুসফুস ক্যান্সারের মতো বড় কোনো রোগ! এটা কি মানুষের উপর অন্যায় করা নয়?

আনিস: আমার খুবই খারাপ লাগছে বন্ধু। না জেনে কতো ভুলই না করে ফেললাম!

এদিকে চাটা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। আমি আনমনে চিন্তা করছি, গোধূলী বেলা আকাশে হয়তো কোনো সূর্য নেই, অস্তমিত প্রদীপের ন্যায় লালচে আলোও কোনো আশা দেখাচ্ছে না। কিন্তু জানি, কিছুক্ষণ পরেই শত আশার আলো সঙ্গে করে নিয়ে আসবে চাঁদের রুপালী জোৎস্না।


সংবাদটি শেয়ার করুন:


স্ট্রোক  ধূমপান  রোগী






























জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

প্রধান উপদেষ্টা: অধ্যাপক ডা. মো. তাহির, সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), ঢাকা
বার্তা কক্ষ: ০১৮৬৭৮৪৪৪৫৩  ই-মেইল: [email protected]
মোবাইল: ০১৮৬৭৮৪৪৪৫১